এক স্বপ্নবাজ কিশোরের গল্প
সে বেড়ে ওঠে বাজিতপুরের শান্ত পরিবেশে। পড়াশোনায় উড়ু উড়ু মন। মাথাভর্তি কেবল খেলাধুলা আর ঘোরাঘুরির নেশা। দশ-বারো বছর বয়স থেকেই পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তো দেশ-দেশান্তরে। এই নেশাই তাকে পৌঁছে দেয় জীবনের অন্য এক সিঁড়িতে।
একদিন পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারণে ঢাকা চলে আসতে হয় লেখাপড়ার জন্য ভর্তি হয় অষ্টম শ্রেণীতে।রাজধানীতে শিখেছেন অনেক কিছুই, কীভাবে মানুষের সেবা করতে হয়। মেঘে মেঘে দুর্দান্ত বালকটি কিশোর হয়ে ওঠে। SSC পরীক্ষা শেষ করে মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে ফিরে আসেন বাজিতপুর।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর দেশকে যারা এ পথে নিয়ে যাচ্ছে, দেশ গড়ার কারিগর তারাই। ফারদিন মাহবুব একটি নাম নয়, দেশ গড়ার কারিগর দলের একনিষ্ঠ সৈনিকও বটে। তথ্য-প্রযুক্তিকে মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়ার ব্রত তার। আর এ উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ফারদিনের ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান Ubernet Bajitpur Branch তথ্য-প্রযুক্তিতে এ সফল উদ্যোগতার গল্প, ভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই এ আয়োজন।
সময়টা 2016 এর শুরু সাল। নতুন শতাব্দীর শুরু। আক্ষরিক অর্থেই বাজিতপুরের জন্য এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন সেদিনের সেই কিশোর। নাম, ফারদিন মাহবুব (প্রান্ত)। ইউবারনেট (Ubernet) বাজিতপুর শাখার প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ঢাকায় থাকাকালীন সময়ে ফারদিন আরেক তরুণ উদ্যোক্তা মুত্তাকীম ইসলামের সংস্পর্শে আসেন। তার ছোঁয়াতেই বদলে যায় ফারদিন মাহবুবের জীবন।
শোনা যাক তার মুখেই, আমার পরিকল্পনা ছিলো, স্থায়ীভাবে বাজিতপুরে থেকে নেটওয়ার্ক এর উপর কিছু করার। তখন আমার বয়স অল্প, আমার হাতে টাকা নেই। তখন আমি খালামনিকে বললাম, আমি বাজিতপুরে ইন্টারনেট সেবা দিতে চাই। এজন্য একটি ‘ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান’ করবো।
‘এখানে আমার বড় খালা( যাকে আমরা সব কাজিনরা বড় মা বলে ডাকি)সুরাইয়া সম্পর্কে দু’-একটি কথা বলি।উনি আমেরিকা প্রবাসী, একজন আদর্শ মা এবং সফল নারী উদ্যোক্তা।সত্যিই আনেক বড় মাপের মানুষ।আমার পরিকল্পনা নিয়ে ওনার কাছে গেলাম। উনি সবসময় দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু একটা করতে বলতেন যাতে মানুষ উপকৃত হবে। চারপাশে যা কিছু রয়েছে সেগুলোকেই ব্যবহার করার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। আমি তাকে গুরু হিসেবে মানি। এই যে এতোকিছু, এর চিন্তাধারার অধিকাংশই আমি পেয়েছি তার কাছ থেকে উনিই আমাকে এভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন।’
প্রথম ভাবনা
ফারদিন মাহবুব স্কুল জীবন থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু সে সময় ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করতে হত। এ সমস্যার কারণে তার অনুধাবন হয় যে এটি ব্যয় বহুল হওয়ায় অনেকে এ সেবা গ্রহন করছে না। এতে আধুনিক বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের জনগণ বেশ পিছিয়ে পরবে। এ ভাবনা থেকেই সে সিধান্ত নেন সবাইকে সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করবে। এবং দেশের ছাত্র সমাজকে ইন্টারনেট ব্যবহারের সাথে যুক্ত করে প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।
সূচনার গল্প
২০ সালে ঢাকা কলেজে বিকম অধ্যায়নরত সময়ে এ উদ্যোক্তা নিজ সঞ্চয়কৃত ৫০০০ টাকা ও শুভাকাঙ্খীদের সহায়তায় ফার্মগেট এলাকায় সাইবার ক্যাফের যাত্রা শুরু করে। এ সময় অনেকেই ইন্টারনেট সম্বন্ধে ধারনা না থাকায় সাইবার ক্যাফেকে ফোন ফ্যাক্স এর দোকান হিসেবেই জানত। ফলে বিদেশে ফোন করার জন্য অনেক গ্রাহক পাওয়া যায়। তবে সে সকল গ্রাহকদের মধ্যে যারা শিক্ষিত ছিল তাদেরকে ইন্টারনেট বিষয়ে ধারনা দিয়ে নেট ব্রাউজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেন তাসকিন। গ্রাহক বাড়ানোর লক্ষ্যে ফ্রি ব্রাউজং এর সুযোগ দেয়া হত। আস্তে আস্তে নেট ব্রাউজের গ্রাহক বেশ বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা সফলতায় তিনি আরও এগিয়ে যাওয়া সাহস পান।
মাঝপথে দাড়িয়ে
সাইবার ক্যাফে ব্যবসার পাশাপাশি তরুণ ব্যবসায়ী ৫১২ স্প্রিড এর লাইন বেশ কিছু গ্রাহকদের বাসায় সংযোগ দেন। কারন সে সময় ক্যাফেতে নেট ব্রাউজ করে অনেকেই ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তা সম্মন্ধ্যে উপলব্ধি করেন। কিছু দিনে গ্রাহকদের সংযোগ দেয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তবে ফারদিন মাহবুব লাইসেন্স এর কারণে স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছিলেন না। কারন একটি লাইসেন্স গ্রহনে তৎকালীন সময় প্রচুর টাকা ব্যয় করতে হত। ২০০১ সালে তৎকালীন ইন্টারনেট ব্যবসার সংগঠন ISP এসোসিয়েশন ঘরে ঘরে গ্রাহকদের ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া দায়িত্ব ছিল। তা না করে এসোসিয়েশন শুধু লাইসেন্স ও ব্রান্ডউইথ বিক্রয় করতো। যার ফলে তারাই আমাদের বেশ কিছু গ্রাহক তৈরি করে দেয়।
বিশালতার পথে
কল্পনার চোখে
২০০৭ সালে ঈদের নামাজ পরে বাসায় যাচ্ছিলেন তাসকিন। পথিমধ্যে খবর পান যে নেটের ব্রান্ড উইথ কমে গিয়েছে। তিনি সাথে সাথে বাসায় পা না বাড়িয়ে ব্রান্ড উইথ ঠিক করতে পা বাড়ান। ফারদিন বলেন এ ব্যবসাকে ভালোবাসি বলেই সর্বোচ্চ সময় ব্যবসায় ব্যয় করা হয়। তিনি আরও বলেন ইন্টারনেট সেবা গ্রহণকারীদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি অর্জন করাই আমার এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য। কল্পনার চোখে দেখেন একদিন বাংলাদেশ তথ্য-প্রযুক্তিতে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়াবে। তার মতে এ সেক্টরে সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এ খাতে এখনও তেমন সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্টারনেটের ইতিবাচক-নীতিবাচক উভয়ভাবে ব্যবহার করা যায়। তাই নীতিবাচক ব্যবহার রোধ করার জন্য সরকারকে অবশ্যই কঠোর হাতে অনলাইন নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে।
সরল পথের যাত্রী
তথ্য-প্রযুক্তিতে সকলের জ্ঞান না থাকায় সবাই এ ক্ষেত্রে ব্যবসায় লিপ্ত হতে পারছে না। তবে শিক্ষিত ব্যক্তিরাই এ ব্যবসার সাথে জড়িত। এতে করে বেশ সাফল্যের সাথে এ সেক্টরটি এগিয়ে যাচ্ছে। তবে যেই এ ব্যবসার সাথে জড়িত হতে ইচ্ছুক তাদের প্রতি ইন্টারনেট সেবা খাতে সফল ব্যবসায়ী ফারদিন মাহবুব বলেন অবশ্যই এ ব্যবসা সম্পর্কে সঠিক ও সর্বোচ্ছ ধারনা নিয়ে পথ বাড়াতে। এবং MCNA কোর্স করলে তার এ ব্যবসা পরিচালনা করতে তেমন কঠিন বাঁধায় পড়তে হবে না। তাসকিন নিজেকে সফল হিসেবে মানতে নারাজ। তিনি বলেন গ্রাহক আমাকে সফল বলেই আমি নিজেকে সফল বলতে পারি। কারন গ্রাহকই আমার সকল সাফল্য এবং তারাই আমার শুভাকাঙ্খি। গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টিই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য: ফারদিন মাহবুব ।
