ফটোগ্রাফিতে মুক্তিযুদ্ধ এবং একজন কিশোর পারেখ
কিশোর পারেখ (১৯৩০-১৯৮২) একজন ভারতীয় ফটোগ্রাফার। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বের নানা দেশের নামী-দামী পত্র-পত্রিকার সাংবাদিক ও ফটো সাংবাদিক অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এদের মধ্যে পারেখ ছিলেন ব্যতিক্রম যিনি কোন অ্যাসাইনমেন্ট ছাড়াই স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছিলেন। মাত্র ৮ দিনে তাঁর তোলা ৬৭টি ছবি মুক্তিযুদ্ধের এক অসামান্য দলিল হয়ে আছে। এ ছবিগুলো অবলম্বন করে পরে তিনি বাংলাদেশ : এ ব্রুটাল বার্থ নামে একটি ফটোগ্রাফি বই প্রকাশ করেন। ভারত সরকার তাঁর ছবি দেখে বইটির ২০ হাজার কপি অর্ডার দেন।
কিশোরের জন্ম ১৯৩০ সালে। ভারতে । ১৯৫৬ সালে কিশোর যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় তার প্রিয় বিষয় ফিল্মে ভর্তি হন । ফিল্ম নিয়ে পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি ঝুঁকে পড়েন ফটোগ্রাফিতে। কিশোর লাইফ ম্যাগাজিন এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি কনটেস্টে সাতটি ক্যাটেগরির মধ্যে ছয়টিতে পুরষ্কার জিতে নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সর্বপ্রথম লাইম লাইটে আসেন।
১৯৬১ সালে শিক্ষা শেষে মাতৃভূমিতে ফিরে এসে তিনি চেষ্টা করেন তাঁর মেধা বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজে লাগাতে। কিশোরের ধারণা ছিল দেশে আসার পরপরই বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাকে লুফে নেবে। কিন্তু তা হয়নি। তবে ভারতের প্রভাবশালী বিড়লা পরিবার কিশোরের মেধা দেখে তাঁকে কাজের সুযোগ করে দেন। কিশোর যোগ দেন তাদের পত্রিকা দি হিন্দুস্তান টাইমসের চিফ ফটোগ্রাফার হিসেবে। এর পর ছয় বছর কিশোর কাজ করেন ফটো জার্নালিস্ট হিসেবে। বদলে দেন ইনডিয়ান প্রেস ফটোগ্রাফির চেহারা। ৬১ থেকে ৬৭ সালকে বলা হয় ইনডিয়ান প্রেস ফটেগ্রাফির স্বর্ণযুগ। কিশোর ফটো রিপোর্টের গোটা ফরম্যাটই পাল্টে দেন। ডকুমেন্টেশন বাদ দিয়ে তিনি চলে যান সাবজেক্টের গভীরে। বিহারের দূর্ভিক্ষ কভার করতে গিয়ে তিনি তাঁর মেধার পূর্নাঙ্গ প্রতিফলন ঘটান। জওহরলাল নেহেরুর জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে প্রাঞ্জল ডকুমেন্টেশন কিশোরের ছবি। নেহেরুর মৃত্যুর পর কিশোর পারেখের প্রদর্শনী ভারতীয়দের জন্য হয়ে ওঠে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানানোর স্থান।
৬৭ সালের পর কিশোর পারেখ ফটো জার্নালিজম ছেড়ে দেন। চলে যান সিঙ্গাপুর ও হংকং-এ। যোগ দেন দি এশিয়া ম্যাগাজিন-এ। সেখানে তিনি এক্সক্লুসিভ কিছু ফটো সিরিজ করেন । এরপর তিনি কাজ করেন দি প্যাসিফিক ম্যাগাজিন লিমিটেড-এ। এ প্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন পিকচার এডিটর।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিশোর যখন ট্রাভেল এবং ফ্যাশন ফটোগ্রাফিতে ব্যস্ত, তখন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসবেন। দ্রুত ৪০ রোল ফিল্ম যোগাড় করে তিনি ভারতে চলে আসেন। এক বন্ধু তাকে পৌছে দেয় বর্ডারে। জোর করে তিনি ৮ ডিসেম্বর ঢুকে পড়েন প্রেস হেলিকপ্টারে। কিশোর পারেখ ১৬ তারিখ বিজয় অর্জন পর্যন্ত বাংলাদেশে ছিলেন । এরপর ফিরে গিয়ে টানা তিন দিন তিন রাত ফিল্ম ডেভেলপ করেন আর ৬৭টি সফল ফটোগ্রাফ নিয়ে বের হন।
মুক্তিযুদ্ধের পর কিশোর ফিরে যান কমার্শিয়াল ফটোগ্রাফির পেশায়। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রেস ফটোগ্রাফিতে তিনি আর ফিরে আসেননি । সারা জীবন ফটো সাংবাদিকতার জন্য কাজ করেছেন আর সেজন্য কখনও কারও সঙ্গে আপোষ করেননি। কথিত আছে ফটোগ্রাফারের ভূমিকা পালনকালে নেহেরু জেদি পারেখকে চড় মেরেছিলেন ।
১৯৮২ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে হিমালয় পবর্তে ছবি তোলার সময় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এ অসম্ভব প্রতিভাসম্পন্ন শিল্পী।

