বন্ধ থাকা শিশু পার্কে দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা ও ক্ষোভ

কিশোর বাংলা প্রতিবেদনঃ রাজধানীর শাহবাগে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক শহীদ জিয়া শিশু পার্কে ছয় বছরের শিশু সন্তান রামিয়াকে নিয়ে মোহাম্মাদপুরের বসিলা থেকে ঘুরতে এসেছিলেন রাকিব-সাইমা দম্পতি। ঘুরতে এসে পার্ক বন্ধ দেখে ফিরে যাওয়ার সময় সন্তানকে নিয়ে পড়লেন বিড়ম্বনায়। দোলনায় না চড়া পর্যন্ত সে বাসায় না যাওয়ার বায়না ধরে। পেছন থেকে তার বাবা তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলেও কিছুতেই যেতে রাজি না সে। কিন্তু রামিয়াকে কে বুঝাবে- কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই শিশু পার্কটি বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে ৪০ বছরের পুরনো এই শিশু পার্কটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বন্ধ হলেও নগরবাসীর অনেকেই সে তথ্য জানেন না। ফলে অনেকেই শিশু-সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে বিনা নোটিশে পার্কটি বন্ধ করে দেয়ায় অনেকেই ক্ষোভ ও হতাশাও ব্যক্ত করছেন। পার্কটি হঠাৎ বন্ধ করে দেয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বেচা-বিক্রিও কমে গেছে।

জানা গেছে, ঐতিহাসিক এ পার্কে অত্যাধুনিক রাইড স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং, দৃষ্টিনন্দন জলাধার, আন্ডারপাস, মসজিদ নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২৬৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ চলবে বলে জানা যায়।

পার্কটি গত ১ জানুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে। অনেকেই তাই ছোটদের নিয়ে ঘুরতে এসে বিফল মনোরথে ফিরে যাচ্ছেন। কেন বন্ধ, তা জানারও উপায় থাকছে না। ১৯ দিন পর পার্কটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মনে পড়েছে ব্যানার দেয়ার কথা। গতকাল রবিবার এটি ঝুলানো হয়েছে। যেখানে লেখা রয়েছে, উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য এটি আপাতত বন্ধ থাকবে। প্রকল্পের কাজ শেষে আবার তা খুলে দেয়া হবে।

তবে ডিএসসিসি’র ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে দাবি করা হচ্ছে, ব্যানার ঝুলানো হয়েছে ৬ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু সেই ব্যানারেই ৭ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনও কোনও জাতীয় দৈনিকে শিশু পার্ক বন্ধের বিজ্ঞপ্তি ছিল, তা উল্লেখ করা হয়েছে। তার মানে ব্যানারে যে তারিখ উল্লেখ আছে, আসলে তা তৈরি ও লাগানো হয়েছে অনেক পরে।

তবে ডিএসসিসি’র সহকারী প্রকৌশলী ও শিশুপার্কের ম্যানেজার জাকির হোসেন জানান, নোটিশ দিয়েই পার্কটি বন্ধ করা হয়েছে। এসময় পার্কের দুটি প্রবেশ পথে ঝোলানো একটি বিজ্ঞপ্তির কথা জানান তিনি।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে লেখা রয়েছে- ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় শাহবাগ শিশু পার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন কাজ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় শিশুপার্ক সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে। পার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজের সমাপ্তির পর শিশু পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য খোলার বিষয়ে পুনরায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।

এরইমধ্যে পার্কের উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। পার্কে চলছে নতুন রাইড বসানোর কাজ। ভেঙে ফেলা হয়েছে পুরনো রাইডগুলো। সেই সঙ্গে চলছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিচে ভূ-গর্ভস্থ ৫০০টি গাড়ি রাখার পার্কিংয়ের কাজ। এ প্রকল্পে পার্ক ও উদ্যান মিলিয়ে কয়েকটি ফুড কোর্ট, দৃষ্টিনন্দন জলাধারসহ হাঁটার পথ, দর্শনার্থীদের জন্য বসার স্থান, আন্ডারপাস, মসজিদসহ আনুষাঙ্গিক আরও বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রকৌশলীরা।

ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে ১৯৭৯ সালে ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’ নামে পার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শিশুদের বিনোদনের জন্য পাবলিক সেক্টরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম এই শিশুপার্কটি ১৯৮৩ সাল থেকে শিশুদের বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ১৫ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এ পার্ক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

শিশু পার্কটিতে ১২টি রাইড রয়েছে। যেখানে একটি খেলনা ট্রেন, একটি গোলাকার মেরিগো রাউন্ড রাইড ও একাধিক হুইল রাইড রয়েছে। ১৯৯২ সালে এ পার্কে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে সৌজন্য হিসেবে একটি জেট বিমান দেয়া হয়। রাজধানী ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রগুলোর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম খরচ হওয়ায় সারা বছর ধনি-গরিব সবশ্রেণির মানুষের কাছে এই শিশু পার্কটি ছিল বিনোদনের আদর্শ স্থান।

বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রতি শুক্রবার পার্কটি বেলা ২টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চালু ছিল। রবিবার ছাড়া শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত রাইডগুলো চালু থাকত। এ শিশুপার্কে প্রতিদিন ছয় হাজারেরও বেশি মানুষে আসত। আর ঈদ-উল ফিতর ও ঈদ-উল আজহার কিংবা জাতীয় উৎসবগুলোতে শিশু পার্কটি হয়ে উঠতো শিশু-কিশোরদের মিলনমেলা।