মোসাম্মৎ সেলিনা হোসেন : দেশের প্রতিটি শিশু-কিশোরদের জন্য শ্রম নয়, চাই আনন্দময় জীবন। এ চাওয়া আমাদের সকলের। কিন্তু চাওয়া মেতাবেক কী কিছু ঘটছে? ঘটছে না। কোথাও কোথাও তা ব্যহত হচ্ছে। যেসব ঘটনা আমাদের আহত করে, ব্যথিত করে। আমরা ইদানিং সময়ে এমন অমানবিক সব ঘটনার জন্য লজ্জিত হই। কখনো কখনো বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি সেরে ফেলি। হাল আমলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সোস্যাল মিডিয়া সরগরম করে দিন দুয়েক পরে সব চুকেবুকে ফেলি। এভাবেই হর-হামেশা আড়ালে চলে যায় আলোড়ন তোলা সব ঘটনা। অনেক ঘটনার তিলকে আবার মিডিয়ার কল্যানও জুটে না। সেগুলো আড়ালে-আবডালে নিভৃতে মুছে যায়। যা জনসম্মুখে আসে না কখনোই।
একুশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ আমাদের দেশ উন্নত দেশের সারিতে থাকবে। সে লক্ষ্যে আমরা দিনকে দিন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি। নিয়ম মাফিক সবকিছু চলছে । তবে এরমধ্যে কিছু ব্যতিক্রম ঘটনাও ঘটছে। যা হওয়া উচিৎ ছিল না এমন কিছু অনিয়মের ঘটনাও ঘটছে।   
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মতোই বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরশ্রম বিদ্যমান ও দৃশ্যমান। শিশু-কিশোরশ্রম মানেই আমাদের শিশু-কিশোররা সামাজিক ও একটি জটিল দুষ্ট চক্রের আবর্তে ঘূর্ণায়মান জীবনের চাকায় প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে। যে বয়সে একটি শিশু-কিশোরের বই, খাতা, পেন্সিল নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, দুরন্তপনা ও চঞ্চলতা নিয়ে খোলা মাঠে মুক্ত হাওয়ায় ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়ানোর কথা, হাসি-খুশি ভরা আনন্দচিত্তে খেলার সাথী ও সহপাঠীদের সাথে মেতে ওঠার কথা— ঠিক ঐ বয়সেই শিশু-কিশোরকে নেমে পড়তে হয় কঠোর সংগ্রামে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিতা-মাতা বা অভিভাবকগণ তার পুরো পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার বহন করতে পারেন না; তাই শিশু-কিশোরসন্তানকে উৎসাহিত করেন যেকোনো কাজে নিয়োজিত হতে— যার ফলে পরিবারের আয়-উপার্জনের দায়ভার কিছুটা হলেও হ্রাস পায়।
কখনো কখনো শিশু-কিশোররা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদেই কঠিন শ্রমের পথ বেছে নেয়। তখন কোন্ কাজটি সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ কিংবা তাদের জন্য ক্ষতিকর নয়— এ বিষয়গুলো ভাববার কোনোই অবকাশ থাকে না। কাজেই তারা, কৃষি খাতে, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে, মাছের শুঁটকি তৈরি করা, বিড়ি ফ্যাক্টরি, চামড়া ফ্যাক্টরি, কাঁচ ফ্যাক্টরি, প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি, রাসায়নিক দ্রব্যাদি তৈরির ফ্যাক্টরি বা কারখানায়/ওয়ার্কশপে, হোটেল-রেস্তোরাঁয়, বাসা-বাড়িতে গৃহপরিচারিকা হিসাবে, হাট-বাজারের বোঝা টানা, মিন্তি, ভিক্ষাবৃত্তি, রিকশা, ভ্যান, ঠেলা টানাসহ বিভিন্ন ধরনের পেশায় নিয়েজিত হয়। এই শিশু-কিশোররা বিভিন্নভাবেই শারীরিক, মানসিক ও সকল ধরনের অপব্যবহার, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়।
বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কৌশলকে বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলো একটি মডেল হিসাবে দেখছে, যা অত্যন্ত আশাপ্রদ। অন্যদিকে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদসহ আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার শিশু বিষয়ক অধিকাংশ সনদ অনুসমর্থনও করেছে বাংলাদেশ। এরপরও যারা এই দেশের ভবিষ্যত্ কর্ণধার হবে, হবে দেশের মূল চালিকাশক্তি সেই শিশু-কিশোরদের উল্লে­খযোগ্য অংশ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সাথে নিয়োজিত আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) শিশু শ্রম বিষয়ক জরিপ বাংলাদেশ-২০১৩ এর তথ্য অনুযায়ী: বাংলাদেশে ৫-১৭ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা ৩৯.৬৫ মিলিয়ন, কাজে নিয়োজিত ৫-১৭ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা ৩.৪৫ মিলিয়ন, শিশু শ্রমে নিযুক্ত শিশু ৫-১৭ বছর বয়সের তাদের সংখ্যা ১.৭ মিলিয়ন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমের সাথে যুক্ত শিশু ৫-১৭ বছর বয়সের সংখ্যা ১.২ মিলিয়ন, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ০.১২ মিলিয়ন এবং কৃষি কাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১.২৭ মিলিয়ন।
জাতীয় শিশু শ্রম নিরসন নীতি ২০১০, শিশু আইন, ২০১৩ প্রণয়নসহ শিশুদের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে বহুবিধ ও বহুমাত্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে সবগুলোই টাইমবাউন্ড প্রজেক্টভিত্তিক। আর সে কারণেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাইরে থেকে যাচ্ছে শত-সহস্র শিশু-কিশোর। নিয়োজিত হচ্ছে কল-কারখানায়, কৃষি খাতে, চা-বাগানে, জাহাজ ভাঙার কাজে, বিড়ি ফ্যাক্টরিতে, কাঁচের, প্ল­াস্টিক ও রাসায়নিক কারখানার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। অপরাজেয়-বাংলাদেশের লালবাগ ও ধোলাইখাল কর্ম এলাকার ২৩০টি কারখানায় নিয়োজিত শিশুর সাথে কাজের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়— তারা দিনে কমপক্ষে ১২-১৪ ঘণ্টা একটানা কাজ করে।
এ অবস্থার অবসানকল্পে শ্রমজীবী শিশুদের দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে তাদের পিতা-মাতা/ অভিভাবকদের আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা; বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় আনা; আদিবাসী সম্প্রদায় ও প্রতিবন্ধী শিশুদের উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা; শ্রমজীবী শিশুদের কল্যাণে নিয়োজিত সকল সেক্টর/প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকরী সমন্বয় সাধন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে শিশু বিষয়ক আইন ও নীতিমালা অন্যতম। এছাড়াও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে একটি বৃহত্ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৩০টিরও বেশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শিশুশ্রম নিরসনকল্পে বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে—ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সাথে যুক্ত শিশুকে শ্রম থেকে প্রত্যাহার করে কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সুযোগ করে দেওয়া, শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা, পরবর্তী সময়ে দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, পরিবারে পুনঃএকত্রীকরণ, বৃত্তি প্রদান, চাকরি বা মর্যাদাসম্পন্ন কাজ প্রদানের মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসন করা।
অন্যদিকে প্রায় ৫১ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সাথে যুক্ত শিশুকে শ্রম থেকে প্রত্যাহার করে কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও শিক্ষায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগটি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের এনজিওদের দ্বারা বাস্তবায়নের কাজ চলমান আছে। এছাড়াও গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের সুরক্ষা ও শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য এনজিওদের একটি নেটওয়ার্ক ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরেও অনেক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা স্থানীয় পর্যায়ে নেটওয়ার্ক গঠন করে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে।
একটি বেসরকারি সংস্থা বিগত ২০ বছরে ৮০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে প্রত্যাহার করেছে এবং এক লাখ দুই হাজার শিশুকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং ৬৫ হাজার শিশুকে সমাজের মূল স্রোতধারায় মর্যাদাসম্পন্ন কাজে নিয়োগ দিতে সহায়তা করেছে এবং ছয় হাজার শিশুকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সহযোগিতা করেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন ও শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তকরণে সরকারের ভূমিকা বরাবরই মুখ্য। এ ক্ষেত্রে আমাদের সুপারিশ হলো : ছোট-বড় কলকারখানা, ফ্যাক্টরিতে সরকারি পরিদর্শন নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা এবং এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ করা। সরকার ঘোষিত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকা ব্যাপকভাবে রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করা। সরকার ঘোষিত আইন ও নীতিমালাসমূহের প্রচার ও সংশ্লিষ্ট জনগণকে সচেতন করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। শিশুশ্রমের সাথে যুক্ত শিশুদের সংখ্যা হালনাগাদ জাতীয় জরিপের উপর ভিত্তি করে নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করা আবশ্যক।
 
 
লেখক পরিচিতি : মোসাম্মৎ সেলিনা হোসেন, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

LEAVE A REPLY